
প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কাউন্সিলর এবারের সম্মেলনে যোগ দেবেন। কিন্তু দলের নীতি বা নেতৃত্ব নির্বাচন কিংবা দলের যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে মতামত দেয়ার কোনো সুযোগ কি কাউন্সিলররা পাবে ?
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দেয়া ভাষণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন “এই সম্মেলন সফল হোক। আপনারা আপনাদের নেতা নির্বাচন করবেন। সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এ সংগঠনকে শক্তিশালী করা ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহানগরের নেতা নির্বাচনে কাউন্সিলরদের তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি।
বরং নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা বরাবরের মতো নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব শেখ হাসিনার হাতেই তুলে দিলে তিনিই চূড়ান্ত নেতৃত্ব নির্ধারণ করেছেন। এর আগে দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলনে এবং তারও আগে আওয়ামী লীগেরই গত কয়েকটি সম্মেলনেও দেখা গেছে একই চিত্র।
ঢাকায় সভানেত্রীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে কয়েকজন নেতাকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মতামত দেয়ার সুযোগ কতটা আছে?
জবাবে একজন বলেন অবশ্যই আছে। কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী নেতা নির্বাচন হয়ে থাকে।
খলিলুর রহমানে নামে আরেকজন বলেন কাউন্সিলরদের মতামতই আগে নেয়া হয়। তারাই হাত তুলে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।
পংকজ দাস নামে একজন বলেন নেতা নির্বাচনে সবসময়েই কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতেই করা হয়।
হেমায়েত উদ্দিন বলেন প্রথমে তো কাউন্সিলরদের মতামত নেয়া হয়। তাদের হাতেই ক্ষমতা থাকে। তারাই সে ক্ষমতা হয়তো সভানেত্রীর কাছে অর্পণ করেন। তারপরই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
অর্থাৎ এটি পরিষ্কার যে দলের নেতাকর্মীরাও অনেকটা মেনেই নিয়েছেন যে সম্মেলনে দলীয় প্রধানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন বিশেষ করে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে| একই চিত্র ঢাকার বাইরের কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রেও। দক্ষিণাঞ্চলীয় বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুন নাহার মেরীও যোগ দেবেন এবারের কাউন্সিলে।
তিনি বলছেন তারাও জানেন যে একদিনের সম্মেলনে সবার কথা বলার সুযোগ দেয়া অসম্ভব।
“নেত্রীর কথা মতোই কাউন্সিল হবে। এতো বড়ো কাউন্সিল সেখানে তো সব মূল্যায়ন করা যাবেনা। ত্রি বার্ষিক কাউন্সিল-সেখানে সবাইকে তো কথা বলার সুযোগ দেয়া যাবেনা। নেত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত”।
আওয়ামী লীগের ৭৮ টি সাংগঠনিক জেলা থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কাউন্সিলর যোগ দিয়েছেন এবারের সম্মেলনে।
সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। জেলা ও উপজেলাগুলোতে প্রতিদিনই সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন করে কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার জন্য দলের তরুণ নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দলটির গত সম্মেলনেও কয়েকজন নতুন নেতাকে জায়গা দেয়া হয়েছিলো। এবারেও নতুন করে কেউ আসেন কি-না কিংবা দলীয় প্রধানের পরিবার থেকে আর কেউ কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসবেন কি-না এসব নিয়ে আগ্রহ আছে দলীয় পরিমণ্ডলে। তবে এবারের কাউন্সিলের মাধ্যমে যে কমিটি গঠিত হবে তার নেতৃত্বেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিবে পরপর তিন দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। তাই দলটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার পদে থাকছেন কিনা কিংবা নতুন কেউ এলে তিনি কে হতে পারেন এসব নিয়েও সরগরম আলোচনা হচেছ কর্মীদের মধ্যে।
কিন্তু এর কোনো কিছুতেই কর্মী সমর্থক বা কাউন্সিলরদের কোনো ভূমিকা থাকবে কি-না বা তাদের মতামত দেয়ার সুযোগ মিলবে কি-না তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা চোখে পড়েনি সভানেত্রীর কার্যালয়ের বাইরে থাকা কর্মী সমর্থকদের মধ্যে।
রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেত্রী ও কাউন্সিলর মরজিনা পারভীন বলছেন তারা আশা করছেন কাউন্সিল থেকে ভবিষ্যৎ যোগ্য নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে সেটা ভোটই হোক আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই হোক।
তিনি বলেন, “যদি একাধিক প্রার্থী থাকে তখন ভোটের মাধ্যমে হয়।আর যদি সবাই সমর্থন দেয় তাহলে হাত তোলার মাধ্যমেও হতে পারে। কিন্তু কেউ ছাড় না দিলে ভোটের মাধ্যমে। তবে যাই হবে কাউন্সিলরদের সমর্থন নিয়েই। তারা যা চাইবে তাই হবে”।
অর্থাৎ কাউন্সিল বলতে আসলে এখন শুধু নতুন কমিটি ঘোষণাই মূল বিষয়। তাও সেখানে প্রতিযোগিতা না থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় প্রধান। কিন্তু দলীয় প্রধানে অনানুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া কারও পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রার্থিতা ঘোষণা সম্ভব কি-না এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজী হননি দলটির একজন নেতাকর্মীও।
এমনকি কাউন্সিলের নেতা নির্বাচনের বাইরেও দলের নীতি আদর্শ কিংবা দলের যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে সেক্ষেত্রে ভুল ত্রুটি বা নীতিগত কোনো বিষয়ে কাউন্সিলরদের আলোচনার সুযোগ সাম্প্রতিক কালের দলের কাউন্সিলে দেখা যায়নি। অথচ সম্মেলনের মাধ্যমেই দলীয় নীতি পরিবর্তনের উদাহরণ আছে আওয়ামী লীগেরই। ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

