অগ্নিঝরা মার্চের তৃতীয় দিন ৩ মার্চ ১৯৭১—বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন ঘোষিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এবং পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার।
ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়—৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত সাত কোটি মানুষের আবাসভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। একইসঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর নাম ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহার পাঠের পর তুমুল করতালির মাধ্যমে প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পল্টন ময়দান ও আশপাশের এলাকা। জনসভায় ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, দীর্ঘজীবী হউক’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘গ্রামে গ্রামে দুর্গ গড়, মুক্তিবাহিনী গঠন কর’সহ বিভিন্ন স্লোগান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সেই জনসভা থেকেই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)-এ ঐতিহাসিক সমাবেশের ঘোষণা আসে। পরবর্তীতে ওই সমাবেশেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেন, যা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পথে ঐক্যবদ্ধ করে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩ মার্চ ঢাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো এবং সারা দেশে প্রথম দিনের জন্য সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। হরতালে নগরজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ ও সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হন।
রংপুরে সেনাবাহিনী ও জনতার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে দুপুর আড়াইটা থেকে ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। সিলেটে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকে। ঢাকায় কারফিউয়ের সময়সীমা শিথিল করে রাত ১০টা থেকে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কার্যকর রাখা হয়।
এদিন রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ১০ মার্চ ঢাকায় নেতাদের সম্মেলনের ঘোষণা দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তবে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, গণতান্ত্রিকভাবে প্রণীত সংবিধান ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। একই প্রেক্ষাপটে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো-কে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনারা আপনাদের শাসনতন্ত্র রচনা করুন, বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র আমরা নিজেরাই প্রণয়ন করব।”
এদিকে গুলিবিদ্ধ আহতদের জীবন রক্ষায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের জন্য রক্তদানের আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন, স্বাধিকারবিরোধী চক্র লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আন্দোলনকে বিপথগামী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে—এ চক্রান্ত রুখে দাঁড়াতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে।
৩ মার্চ তাই কেবল একটি ইশতেহার ঘোষণার দিন নয়; এটি ছিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার, জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা এবং চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।


