বাংলাদেশে বিরোধী দল বিএনপি তৃতীয় দফায় টানা ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। নতুন করে ঘোষিত অবরোধ বুধবার সকাল ছয়টা থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার ১০ নভেম্বর সকাল ছয়টা পর্যন্ত চলবে।
সোমবার বিকেলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আট ও নয় নভেম্বরের এই অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার একদিন বিরতি দিয়ে বুধবার ভোর থেকে আবারও সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বাত্মক অবরোধ পালন করা হবে।
এর আগে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপি একাধিক কর্মসূচি পালন করে। গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় দলের মহাসমাবেশের পরদিন একদিনের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে দলটি। এরপর একদিন বিরতি দিয়ে ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের অবরোধ পালন করা হয়। পরে জামায়াতে ইসলামীসহ বিএনপির সমমনা দলগুলো একই ধরনের কর্মসূচি দেয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় চলতি সপ্তাহের শুরুতে আবার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি, যা মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
দ্বিতীয় দফা অবরোধের শেষ দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অন্তত পাঁচটি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুপুরের দিকে ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় বঙ্গবন্ধু স্কয়ার হল মার্কেটের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। আগুন লাগার সময় বাসটিতে যাত্রী থাকলেও এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে সোমবার ভোরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় একটি মালবাহী ট্রাকে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও পটিয়া এলাকায় দুটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এছাড়া রবিবার রাতে ঢাকার হাজারীবাগ, পোস্তগোলা, বাংলামোটর এবং গাজীপুরের কদমতলী এলাকায় চারটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। খিলগাঁও এলাকায় একটি লেগুনাতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে রবিবার রাতে তাকে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল।
গত কয়েকদিনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ২৮ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় ঢাকায় মোট ৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের দুই হাজার ১৭২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অবরোধের প্রথম দিনের মতো সোমবারও ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। টার্মিনালগুলোতে টিকিট কাউন্টার খোলা থাকলেও যাত্রী সংকটের কারণে বাস ছাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঢাকার আশপাশের এলাকায় স্বল্প দূরত্বের কিছু বাস চলাচল করেছে।
সোমবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম যান চলাচল করতে দেখা গেছে। লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, ধানমণ্ডি, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, তেঁজগাও, মহাখালী, গুলশান, মিরপুর, বাংলামোটর, কাকরাইল ও মতিঝিল এলাকায় সীমিত সংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক ও পিকআপ চলাচল করেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। তবে রিকশা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার সংখ্যা ছিল বেশি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
রেল যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। সোমবার সকালে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে যাত্রীর সংখ্যা স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কম লক্ষ্য করা গেছে।
অবরোধ চলাকালে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি সরকার সমর্থক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি, গাবতলী, কুড়িলসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও সমাবেশ করতে দেখা গেছে তাদের। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। অনেক জায়গায় লাঠি-সোটা হাতে অবস্থান নেন সরকার সমর্থকরা। তবে এসব এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি।
গত কয়েকদিনের মতো সোমবারও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও র্যাবের একাধিক দল টহল দিতে দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে টানা নয় দিন ধরে বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ২৮ অক্টোবর দলের মহাসমাবেশের দিন কার্যালয়টি খোলা ছিল। সেদিন সংঘর্ষ ও প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে কার্যালয়ে আর নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। কার্যালয়ের সামনে গত কয়েকদিন ধরেই পুলিশের অবস্থান রয়েছে।
অবরোধের প্রথম দিনে, অর্থাৎ রবিবার, ঢাকার উত্তরা এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়। একই দিন বগুড়ায় বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
অবরোধ ও সহিংসতার মধ্যেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নতুন করে ঘোষিত তৃতীয় দফা অবরোধকে কেন্দ্র করে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।


