রাজধানী ঢাকার কাছে গাজীপুরে এর আগের নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন হঠাৎ করেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ২০২১ সালের নভেম্বরে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। এরপর তাকে মেয়র পদ থেকেও বরখাস্ত করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে।
সম্প্রতি দল বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর আবারো নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার বদলে দল বেছে নিয়েছে গাজীপুর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের একজন আজমত উল্লাহ খানকে। তিনি ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটির প্রথম নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থীর কাছে। সেবার জাহাঙ্গীর আলম মনোয়ন চেয়ে পাননি।
অন্যদিকে বরিশালের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন বরিশালে কর্মরত একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে হামলার ঘটনায়। ২০২১ সালের অগাস্টে ওই ঘটনার পর বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডার এসোসিয়েশন তীব্রভাবে মেয়রের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছিলো। এ ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিলো সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে। পরে সরকার সেটি সামাল দিলেও এবার আর মনোনয়নই পাননি বরিশাল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর পুত্র সাদিক আব্দুল্লাহ। তার বদলে মনোনয়ন পেয়েছেন তারই চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ। তবে পারিবারিক পরিমণ্ডলে তারা পরস্পরবিরোধী হিসেবে পরিচিত।
যদিও এতোদিন জেলা ও মহানগর রাজনীতির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠা সাদিক আব্দুল্লাহর নামই একক প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করে কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলো বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ। কিন্তু কেন্দ্র অর্থাৎ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব সেটি বিবেচনাতেই নেয়নি।
ওদিকে সিলেটে মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। মি. চৌধুরী এক সময় সিলেটে ছাত্ররাজনীতি করেছেন। সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণের পর সেখানে দলটি নানা উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো। দলীয় নেতারা বলছেন কোন্দল এড়াতেই মূলত মিস্টার চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে তুলে এনেছেন দলীয় প্রধান।
অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলছেন, “এই তিন সিটিতেই তুলনামূলক ভদ্র, সজ্জন ও লিবারেল নেতারা মনোনয়ন পেয়েছেন। নি:সন্দেহে এটি তুলনামূলক ভালো পছন্দ। এটি নি:সন্দেহে এই দলটির এমপিদের মধ্যে যারা বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে। যারা নিজেদের অনিবার্য ভাবতেন তাদের বাদ দিতে পারাটা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ”।
দলের একাধিকও নেতা বলেছেন আগামী ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাই, দলের ইশতেহার ও ঘোষণাপত্র তৈরি, মিত্র সন্ধানসহ নানা কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।
এর মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য একাধিক জরিপ শেষ হয়েছে এবং আরও জরিপ করা হচ্ছে দলীয় নেতাদের মাধ্যমে, যার মূল উদ্দেশ্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে জানা এবং এলাকায় তাদের অবস্থা কেমন সেটি যাচাই করা।
পেশাদার গবেষণা সংস্থা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি শাখার মাধ্যমে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ত করেও জরিপ করা হচ্ছে। এছাড়া দলীয় প্রধান নিজেও আলাদা করে জরিপ করেছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আর এসব জরিপের উদ্দেশ্য হলো এখন যারা দলের এমপি আছেন এলাকায় তাদের অবস্থা কেমন সেটি যাচাই করা এবং একই সাথে বিকল্প আরও ভালো প্রার্থী আছে কি-না সেটি খুঁজে বের করা। মূলত এবারের মেয়র প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সেটিই গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন দলের সিনিয়র নেতারাও।
দলটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বলছেন এবারের মনোনয়নে শেখ হাসিনা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে দলের যারা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে কিংবা বিতর্কিত হয়েছেন তাদের বদলে গ্রহণযোগ্য নেতাদেরই বেছে নেয়া হবে।
“প্রধানমন্ত্রী সবার সম্পর্কে জানেন। তিনি সব তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আমার মনে হয় আগামী সংসদ নির্বাচনেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে বলেছেন মি. খান।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলছেন সিটি নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন থেকে এই বার্তাই পাওয়া গেছে যে বিতর্কিতদের কিংবা যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে তারাও সামনে থাকবেন না।


