বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক কায়দায় অত্যাচারের গুরুতর অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসি বাংলা কে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাঁর দাবি, এই শ্রেণীটি সবসময় সরকারের বিরুদ্ধে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে লেগে থাকে এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করতে চায়। বিদেশ সফরকালে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি গণতন্ত্র, নির্বাচন, হেফাজতে নির্যাতন, অর্থনীতি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং পদ্মা সেতু সংক্রান্ত গুজবসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেন।
হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের এমন কোনো মানসিকতা নেই যে হেফাজতে নির্যাতন বা হত্যা করা হবে। তাঁর মতে, ঘটনাচক্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে, তবে সরকার এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, গত দশ বছরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবস্থান পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নিজেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর দীর্ঘ সময় বিচার না হয়ে বরং খুনিদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী তাঁর দলের নেতাকর্মীরাই।
নির্যাতনের সংস্কৃতি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে আগের মতো হেফাজতে মৃত্যু বা নির্যাতন হয় না। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং এর বাইরে যাওয়া হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে, যারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তাঁর বক্তব্য, যদি স্বাধীনতা না থাকত, তাহলে সরকার বা তাঁর বিরুদ্ধে এত সমালোচনা ও প্রচার সম্ভব হতো না। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্তের জন্য ট্রাইব্যুনাল, আদালত এবং নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ যদি ভোট দিতে না পারত, তাহলে তারা আন্দোলনে নামত এবং সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারত না।
অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এক সময় দারিদ্র্যের হার যেখানে ৪১ শতাংশের বেশি ছিল, বর্তমানে তা কমে ২১.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৪০০–৫০০ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বেশি বলে তিনি দাবি করেন। ব্যাংকিং খাতে ঋণ খেলাপির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যাটি যতটা প্রচার করা হচ্ছে বাস্তবে ততটা নয়। ঋণ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা সামরিক শাসনের সময় থেকেই শুরু হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত প্রচারের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে। তাঁর মতে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে উচ্চবিত্ত এলাকাগুলোতে। তিনি জানান, মশা নিয়ন্ত্রণ একটি নিয়মিত কার্যক্রম এবং শুধু সিটি কর্পোরেশন নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কোথাও পানি জমে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
পদ্মা সেতুতে কাটা মাথা লাগবে—এমন গুজবের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রক্ত বা কাটা মাথা দিয়ে কোনো সেতু তৈরি হয় না। গুজব ছড়ানোর দায়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে তিনি জানান। পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরু থেকেই একটি চক্রান্ত ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


