প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরকে ‘একপাক্ষিক’ দাবি করে বিরোধী দল বিএনপি বলছে, ‘বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের গোলামি চুক্তির ফাঁদে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আওয়ামী লীগ’। এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দলটি।
শেখ হাসিনার ভারত সফর শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ করা হয়েছে।
ভারতের সাথে করা সমঝোতা ও চুক্তির বিষয়গুলো প্রকাশের দাবি জানিয়ে দলটি বলেছে এর বিরুদ্ধে দেশের মানুষের মাঝে জনমত গড়ে তুলে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “চুক্তি ও সমঝোতার নামে এদেশের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারতের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার অংশে পরিণত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক।”
দলটি বলছে, ভারতের সাথে যে সাতটি সমঝোতা স্মারক নতুন করে সই করা হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবগুলোই বাংলাদেশের ‘উত্তরাঞ্চল কেন্দ্রিক’।
এই চুক্তির মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলকে বাংলাদেশকে থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছে বিএনপি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নতজানু’ বলে বর্ণনা করে দলটি বলছে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে সামরিক ও বেসামরিক পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করতে চায় বলেই রেল ট্রানজিট নিয়েছে ভারত।
যদিও গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কোনও ক্ষতি হবে না।
গত প্রায় দেড় দশক ধরে তিস্তা চুক্তি না হওয়াকেও বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছে বিএনপি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি অভিযোগ করেছে তিস্তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
রেল ট্রানজিট নিয়ে বিএনপির যে প্রশ্ন
গত ২২ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সব সমঝোতা হয়েছে তার মধ্যে একটি ছিল রেল ট্রানজিট সংক্রান্ত। ট্রানজিট চালুর পর ভারতের ট্রেন বাংলাদেশের দর্শনা দিয়ে প্রবেশ করে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবে।
পরীক্ষামূলকভাবে আগামী মাসেই বাংলাদেশ দিয়ে ভারতের ট্রেন চলবে বলেও সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা।
রবিবারের সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের ‘রেল করিডোর’ প্রদান আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।
“বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় রেল ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের জনগণ উপকৃত হবে”, ভারত সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এই দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি মহাসচিব মি. আলমগীর।
তিনি বলেছেন, “একতরফাভাবে ভারতকে করিডোর সুবিধা দেয়ার জন্য এ চুক্তি করা হয়েছে। এ ট্রেন বাংলাদেশের কোনও মানুষ ব্যবহার করতে পারবে না। এতে বাংলাদেশের কোনও লাভও হবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাংলাদেশের কোনও লাভ হবে না, তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে দাবি করেন এ রেল ট্রানজিট বাংলাদেশের মানুষের উপকারে আসবে?”
বিএনপি বলছে, “নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের রেল করিডোর প্রদান আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী হবে।”
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতকে ট্রেন চলাচলের সুযোগ করে দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিএনপি মহাসচিব।
তিনি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, “স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের গোলামি চুক্তির গভীর ফাঁদে ফেলার সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।”
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের উদাহরণ টেনে এই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি বলেছে, “বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নতি না করে ভারতের ট্রেন চলাচল শুরু হলে তা হবে বাংলাদেশের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি। এই ট্রেন চলাচল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে।”


