১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিময় সময়ে বৃহত্তর সিলেটের হাওর অঞ্চলে আবির্ভূত হয় এক দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী। এই দলের নাম দাস পার্টি এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন অকুতোভয় জগৎজ্যোতি দাস। মাত্র ছত্রিশ জন যোদ্ধাকে নিয়ে গঠিত এই বাহিনী পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের মনে ভয় এবং অস্থিরতা তৈরি করেছিল। ভাটি অঞ্চলের প্রতিকূল ভূপ্রকৃতিকে উপেক্ষা করে জগৎজ্যোতি ধারাবাহিক গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন এবং নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের প্রতি তাঁর অটুট নিষ্ঠার প্রমাণ দেন।
দাস পার্টির যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত কঠিন। জলাভূমি, কাদা, অগম্য পথ, সীমিত অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রায়শই অনিশ্চিত পরিস্থিতি। তবুও বুকভরা সাহস, কৌশল এবং দেশপ্রেমকে শক্তি করে জগৎজ্যোতি দলকে এমনভাবে পরিচালনা করেন যে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। তাঁর নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী বারবার সাঁড়াশি আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে ধীরে ধীরে কাছে আসে তাঁর শেষ লড়াই।
১৬ নভেম্বর ১৯৭১। জগৎজ্যোতি কয়েকজন গেরিলাকে নিয়ে রাজাকারদের তাড়া করতে গিয়ে এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন। সঙ্গে ছিল মাত্র কয়েক রাউন্ড গোলাবারুদ এবং কাছেই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। স্থানীয় রাজাকাররা কৌশলে তাঁদের সেই দিকেই নিয়ে যায়। মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে। তবুও জগৎজ্যোতি লড়াই থামাননি। একটি মুহূর্তে তিনি শত্রুর অবস্থান নির্ধারণ করতে মাথা উঁচু করতেই গুলি এসে আঘাত করে তাঁর চোখে। মেশিনগান হাতে তিনি বিলের পানিতে পড়ে যান। শরীরজুড়ে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি শেষবার উচ্চারণ করেন “আমি যাই গা।”
মুক্তিযুদ্ধের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুজিবনগর সরকার তাঁকে প্রথম মরণোত্তর সর্বোচ্চ সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়ার ঘোষণা করে। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র এবং আকাশবাণী দীর্ঘদিন তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাস নামেই প্রচার করে। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তাঁকে বীর বিক্রম পদকে ভূষিত করে।


