ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরের (আগস্ট ২০২৪–ফেব্রুয়ারি ২০২৬) শাসনামলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং বিসিএস কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩২১ জন শিক্ষানবিশ এসআই এবং অন্তত ২৫ জন শিক্ষানবিশ বিসিএস কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে সরকার। সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই এবং কঠোর বিধিমালার আওতায় এমন গণ-অব্যাহতির ঘটনায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অধ্যবসায় ও প্রতিযোগিতার পর পাওয়া চাকরি এভাবে কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ ও ‘তরুণদের রুটি-রুজির ওপর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন সমালোচকেরা।
অনেকেই সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের’ সমতুল্য বলে তীব্র সমালোচনা করছেন। রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৪০তম আউটসাইডার ক্যাডেট ব্যাচের মৌলিক প্রশিক্ষণ চলছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ চলাকালে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গের’ অভিযোগে চার দফায় মোট ৩২১ জন শিক্ষানবিশ এসআইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পুলিশ একাডেমি কর্তৃপক্ষের দাবি, মাঠে নির্দেশ অমান্য করা, ক্লাসে বিশৃঙ্খলা বা নাশতা নিয়ে হইচই করার মতো সুনির্দিষ্ট কারণে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। দফাওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২১-২২ অক্টোবর ২৫২ জন, ৪ নভেম্বর ৫৮ জন, ১৮ নভেম্বর ৩ জন এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ৮ জন এসআইকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে ভুক্তভোগী ও সমালোচকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীর বিরুদ্ধে একসঙ্গে এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নজিরবিহীন।
সামান্য অভিযোগে এভাবে চাকরিচ্যুত করা ওই তরুণদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিসিএস কর্মকর্তাদের ওপর কোপ এসআইদের পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিসিএস উত্তীর্ণ ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও একইভাবে চাকরি হারাতে হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন ক্যাডারের অন্তত ৮৫ জন শিক্ষানবিশ বিসিএস কর্মকর্তাকে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বা শিক্ষানবিশকালে অপসারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১’-এর বিধি ৬(২)(এ) প্রয়োগ করেছে। এই বিধি অনুযায়ী, শিক্ষানবিশ মেয়াদে কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিতে বহাল থাকার অযোগ্য মনে হলে পিএসসির পরামর্শ ছাড়াই সরকার সরাসরি নিয়োগ বাতিল করতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি চাকরিচ্যুত হয়েছেন পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা। ৪৩তম, ৪১তম এবং ৪০তম বিসিএস মিলিয়ে মোট ১৬ জন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) অপসারণ করা হয়। এর মধ্যে ৪০তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে মেধা তালিকায় প্রথম হওয়া কর্মকর্তাও রয়েছেন। এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের ৩ জন শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার, নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারের ২ জন, পররাষ্ট্র ক্যাডারের ২ জন এবং সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ২ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিসিএস কর্মকর্তাদের প্রজ্ঞাপনে চাকরিচ্যুতির সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান অনুযায়ী, চাকরিচ্যুত এসব কর্মকর্তার প্রায় সবার বিরুদ্ধেই ছাত্রজীবনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে থাকা বা প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিশেষ রাজনৈতিক আনুকূল্যে তাঁরা নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নাগরিক সমাজ ও তরুণদের মধ্যে চরম সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকেরা বলছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অতীতের দলীয় সম্পৃক্ততার সন্দেহে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কারও অর্জিত চাকরি কেড়ে নেওয়া মানবাধিকারের পরিপন্থী।
সমালোচকদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজীবন দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবাধিকারের কথা বলেছেন। অথচ তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েই তরুণ মেধাবীদের ‘রিজিকে’ বা কর্মসংস্থানে এমন আঘাত হানার ঘটনা চরম অমানবিক। রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে এভাবে মেধা ও শ্রমের অবমূল্যায়ন দেশের তরুণদের মধ্যে এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। চাকরিচ্যুত তরুণেরা শুধু একটি পরিসংখ্যান নন, তাঁরা শত শত পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন—যা এক আদেশে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।


